মূল্যস্ফীতি বাড়লেও কেন বিশ্ববাজারে কমছে স্বর্ণের দাম?

বিশ্ববাজারে টানা চার মাসের মতো কমছে স্বর্ণের দাম। অথচ এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতির দেশগুলোয় মূল্যস্ফীতি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সাধারণ মানুষের কাছে স্বর্ণ সবসময় একটি আপৎকালীন সম্পদ। ধারণা করা হয়, বাজারের সব জিনিসের দাম বাড়লে স্বর্ণের দামও বাড়ে এবং তা মানুষের সঞ্চয়কে সুরক্ষিত রাখে। কিন্তু বর্তমানের উল্টো চিত্র সবাইকে অবাক করেছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি বাড়লেও মূলত সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমছে। এ পরিবর্তনের ফলে স্বর্ণের চিরাচরিত আচরণ বদলে গেছে। খবর ইউরো নিউজ।

সাধারণত বাজারে সব ধরনের জিনিসের দাম যখন বাড়তে থাকে, তখন বিনিয়োগকারীরা নিজেদের সম্পদ রক্ষার্থে স্বর্ণ কেনেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বর্ণের দামের সম্পর্কটি বেশ জটিল। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বা মূল্যস্ফীতি দ্রুতগতিতে বাড়লেও স্বর্ণের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, তা থেকে এখন এটি অনেক নিচে অবস্থান করছে। এর প্রধান কারণ হলো সরকারি বন্ড বা কোম্পানির শেয়ারের মতো স্বর্ণ থেকে কোনো নিয়মিত সুদ বা লভ্যাংশ পাওয়া যায় না। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, তখন বন্ড থেকে আয়ের পরিমাণ বাড়ে। আর বন্ডের আয় বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণ ধরে রাখার আকর্ষণ অনেকটাই কমে যায়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের বড় ধাক্কা এবং বিশ্বজুড়ে চলমান শুল্ক যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতার কারণে এ জ্বালানি সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে স্বর্ণের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কঠোর আর্থিক নীতি গ্রহণ করেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এরই মধ্যে সুদের হার বাড়িয়েছে। এখন সবার নজর রয়েছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) দিকে, যারা নতুন সিইও কেভিন ওয়ারশের নেতৃত্বে বাজারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে যাচ্ছে।

কেভিন ওয়ারশ তার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকেই স্পষ্ট সংকেত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, ‘বাজারে দামের এ ঊর্ধ্বগতি মূলত নীতিগত ব্যর্থতার ফল এবং তাদের কমিটি বাজারে মূল্যের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ কঠোর অবস্থান বিনিয়োগকারীদের বেশ অবাক করেছে। কারণ বাজারের বড় একটি অংশ ধারণা করেছিল বছরের শেষদিকে হয়তো সুদের হার কমানো হতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। বেশির ভাগ নীতিনির্ধারক চলতি বছর সুদের হার কমানোর পরিবর্তে বাড়ার আভাস দিচ্ছেন। আর্থিক বাজারগুলো এ খবরের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীরা এখন বছরের শেষ নাগাদ অন্তত দুবার সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা করছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এ দ্রুত নীতি পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো স্বর্ণের ভবিষ্যৎ দাম নিয়ে নিজেদের আগের পূর্বাভাস কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে। গোল্ডম্যান স্যাকস সম্প্রতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের জন্য স্বর্ণের দামের পূর্বাভাস আউন্সপ্রতি ৫ হাজার ৪০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৪ হাজার ৯০০ ডলারে নামিয়েছে। ব্যাংকটি সতর্ক করেছে, যদি সুদের হার এভাবেই বাড়তে থাকে, তবে স্বর্ণের দাম আরো কমে আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৪৪০ ডলারে নামতে পারে। ব্যাংক অব আমেরিকার বাজার বিশ্লেষকরাও জানিয়েছেন, নিকট ভবিষ্যতে স্বর্ণের দামে বড় কোনো উল্লম্ফনের সম্ভাবনা খুবই কম। তারা ব্যাখ্যা করেন, সুদের হার বাড়ার উচ্চ সম্ভাবনার কারণে স্বর্ণের দাম বাড়ার সুযোগ প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা এখন অলাভজনক ধাতুর চেয়ে সুদ পাওয়া যায় এমন সম্পদে টাকা খাটাতেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।

বাজার বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, বাজারে মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলেই যে স্বর্ণের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়তে থাকবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বর্ণ তখনই সবচেয়ে ভালো পারফর্ম করে যখন, মূল্যস্ফীতি বেশি থাকে কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার কম বা স্বাভাবিক রাখে। এর একটি স্পষ্ট উদাহরণ দেখা গিয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে, যখন বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং নীতিনির্ধারকরা পদক্ষেপ নিতে অনেক দেরি করেছিলেন। তখন সুদের প্রকৃত হার ঋণাত্মক হয়ে পড়েছিল, ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের সঞ্চয় বাঁচানোর জন্য স্বর্ণ কেনা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০ সালের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ এখনকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুরু থেকেই দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে। পাশাপাশি মার্কিন অর্থনীতি এখনো বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, যেখানে বেকারত্বের হার ঐতিহাসিকভাবে অনেক কম এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল মুনাফা করছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) বড় কোম্পানিগুলোর আয় আগের বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ ধারা বজায় থাকবে। শেয়ার বাজারের চাঙ্গা ভাব বিনিয়োগকারীদের সামনে স্বর্ণের চেয়ে অনেক ভালো এবং লাভজনক বিকল্প এনে দিয়েছে।

সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের জন্য বর্তমান বাজারের এ প্রবণতা একটি বড় অর্থনৈতিক শিক্ষা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন সুদের হার বাড়ানোর জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন শুধু মূল্যস্ফীতি বাড়ছে দেখে অন্ধভাবে স্বর্ণে বিনিয়োগ করলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে সুদের হার যতক্ষণ পর্যন্ত উচ্চস্তরে থাকবে এবং ডলারের মান শক্তিশালী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাস্তব বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামের ওপর এ নিম্নমুখী চাপ বজায় থাকবে।

আরও